ফুলকুমারী


by সমর ইসলাম


ইস্! কী সুন্দর রঙিন ডানা! নাম কি তোমার ভাই?

ফুলকুমারী।

নামটাও ভারী মিষ্টি। আচ্ছা ফুলকুমারী, তুমি আমার বন্ধু হবে?

ফিক করে হেসে ফেলে ফুলকুমারী। তার হাসিটাও অনেক সুন্দর। এক ফুল থেকে আরেক ফুলে উড়ে বড়ায়। রঙিন ডানায় রঙের বাহার। সকালের রোদ লেগে চিকচিক করছে। আমার দিকে তাকিয়ে বললো, কেন বন্ধু হবো না তোমার? তুমিও তো খুব সুন্দর!

আচ্ছা, আমি কি সত্যিই সুন্দর! অনেকেই তো মাঝে মধ্যে পচা বলে আমাকে। সুন্দরও বলে। তবে ফুলকুমারী মিথ্যা বলতে পারে না। এত সুন্দর যাকে দেখতে, সে কি কখনও মিথ্যা বলতে পারে! ফুলকুমারীকে বললাম, আহা! আমার যদি তোমার মতো ডানা থাকতো? তাহলে কি মজাই না হতো!

আবারও ফুলকুমারীর হাসি। বললো, উড়তে চাও আমার সঙ্গে?

হ্যাঁ।

তাহলে এই ধরো আমার ডানা...

কি অ™ভ‚ত! ফুলকুমারীর ডানা ছুঁতেই আমিও তার সঙ্গে উড়তে শুরু করলাম। এক ফুল থকে অন্য ফুলে, এক বাগান থেকে অন্য বাগানে। আমিও যেন প্রজাপতি হয়ে গেলাম। খুব মজা হচ্ছে আমার। ফুলকুমারী অনেক ফুলের পরিচয় করিয়ে দিল আমাকে।

আচ্ছা ফুলকুমারী, তুমি কোথায় থাক?

কেন, ফুলে ফুলে, ডালে ডালে।

তুমি প্রতি শুক্রবার আমাদের বাগানে আসবে। শুক্রবার আমাদের স্কুল ছুটি থাকে। আমি তোমাকে নিয়ে খেলা করবো।

আবারও হাসলো ফুলকুমারী। যেন আমি অনেক বোকা, এমন দেখালো তার হাসিটা। আমি কি সাত সৌর দিবস বেঁচে থাকবো আভা! আর থাকলেও তো বুড়ো হয়ে যাবো।

ফুলকুমারীর কথা শোনে এবার আমার হাসি পেল।  মাত্র সাতদিন বেঁচে থাকবে না মানে? বলে কি বোকা প্রজাপতিটা!

অবাক হচ্ছো, না? ভাবছো আমি এসব কি বলছি? শোন আভা! তোমরা হলে মানব জাতি। আর আমরা কীট-পতঙ্গ। তোমরা শত বছরেরও বেশি বাঁচতে পারো। কিন্তু আমাদের সাত সৌর দিবসই যথেষ্ট। তার ওপর আছে নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ। মানুষের হাতে ধরা পড়ে মারা যাবার ভয়। এই যেমন ধরো, আমার ভাই ফুলকুমার তোমার ভাই অর্কের হাতে প্রাণ হারাল। লাঠিতে কাঁঠালের আঠা লাগিয়ে ধরে ফেলে ফুলকুমারকে। তার দুটো ডানাই আঠাতে জড়িয়ে যায়। কত কষ্টেই না তার মৃত্যু হয়েছে। ডানাবিহীন মরদেহ মাটিতে পড়ে থাকতে দেখেছি।

ফুলকুমারীর ডাগর চোখ পানিতে ভরে গেলো। আমারও খুব কান্না পাচ্ছিল তার কথা শোনে। অর্ক ভাইয়াটা খুব নিষ্ঠুরের মত কাজ করেছে। প্রায়ই সে এভাবে প্রজাপতি ধরে খেলা দেখায়।

ফুলকুমারীর পিঠে আলতো করে হাত বুলালাম। দুঃখ করো না ফুলকুমারী। অর্ক ভাইয়াকে আমি আচ্ছা করে বকে দিব। আর যেন এমন সর্বনাশানা খেলা না খেলে।

আমার কথা শোনার পর শুকনো হাসি খেলে গেলো তার মুখে। বললাম, আচ্ছা ফুলকুমারী, আমার ভাই তোমার ভাইকে হত্যা করেছে জেনেও তুমি আমার সঙ্গে বন্ধুত্ব করলে?

কেন করবো না? অপরাধ করেছে তোমার ভাই, তুমি তো করোনি। তাছাড়া আমরা এত দীর্ঘ সময় রাগ, ঘৃণা, ক্ষোভ পুষে রাখি না।

গতকাল বিকেলের ঘটনা আজ সকালেই দীর্ঘ সময় হয়ে গেলো?

আমাদের কাছে তো তাই। তোমাদের জীবনের হিসাব মিলাও সৌর বর্ষে। আর আমরা মিলাই সৌর দিবসে। আমাদের পুরো জীবনের সাত ভাগের এক ভাগ সময়। তোমাদের কারও আয়ু যদি সত্তর বছর হয়, তাহলে তা দশ বছরের সমান।

ফুলকুমারী আরও কি কি যেন বলছিল...; কিন্তু মায়ের ডাকে ঘুম ভেঙ্গে গেলো আমার। বিশ্বাস হচ্ছিল না, আমি স্বপ্ন দেখছিলাম। আহা, আমার এ বন্ধুটার সাথে আর কি দেখা হবে?

মা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, স্বপ্ন দেখছিলে মা! ওঠো, হাত-মুখ ধুয়ে পড়তে বসো।

মায়ের মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলাম আমি।



Comments
* The email will not be published on the website.