থ্রিলার : ফাঁদ


by নাফিল ইসলাম


আজ চাঁদটা অনেক বড়। আকাশের কোন একদিকে যেনো অনেকটা হেলে পড়েছে। আলোটাও বোধ হয় একটু বেশিই ছড়াচ্ছে। মনে হয় আজ পূর্ণিমা। কিন্তু এখন এতকিছু ভাবার সময় নেই ইফতির। সে যাচ্ছে বিশেষ একটা কাজে। কাজটা শুধু বিশেষ না অতি বিশেষ।

রাত খুব বেশি হয়নি। সবেমাত্র আটটা বাজতে চলেছে। আগের দিনের বৃষ্টিতে রাস্তা পরিষ্কার হয়ে আছে। চাঁদের আলো আর স্ট্রিট লাইটের আলো একসাথে মিলেমিশে এক অদ্ভূত পরিবেশ তৈরি করেছে। ইংলিশ কোচিংটা শেষ হলো কিছুক্ষণ আগে। দেরি হয়ে গেছে। স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি জোরেই হেঁটে চলছে সে। হৃদ স্পন্দনের গতি যে অন্য সময়ের চেয়ে বেশি সেটা টের পাওয়া যাচ্ছে। গন্তব্যটা বেশি দূর না। হেঁটে যেতে দশ মিনিটের পথ। কিন্তু সব দোষটা তো ইংলিশ স্যারের। তার জন্যই তো এই দেরিটা হলো। রাস্তাটা খালি। মানুষজন খুব বেশি নেই। অনেকটা দূরে একটা রিকশা দেখা যাচ্ছে।

হেঁটে হেঁটে ওই গলিটার মুখে চলে এসেছে ইফতি। গলির ভেতরটা অন্ধকার। গলি থেকে কিছুটা দূরে পাশাপাশি দুটো নির্মাণাধীন বিল্ডিং রয়েছে। একটার কাজ প্রায় শেষ। দশতলা কমপ্লিড। অন্যটার কাজ কিছুটা শুরু হয়ে আটকে আছে। অনেকদিন ধরে কাজ বন্ধ। তাই এদিকটাই মানুষের আনাগোনা বেশি একটা নেই।

ইফতির গন্তব্য পাশের বিল্ডিংয়ে। কারণ কেউ একজন ওখানে আজ তার জন্য অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে। এটা ভাবতেই অন্য রকম একটা শিহরণ অনুভব করে সে।

কি বলবে সে এখন, একটু দেরি হয়ে গেল তো? সাবধানে ফোনের টর্চ ধরে লোহার রড ও অন্যান্য জিনিস এড়িয়ে চলে এলো কথা দেওয়া জায়গায়।

কিন্তু একি, কেউ নেই এখানে! নিশি কি এখনো আসেনি? এমন তো হওয়ার কথা না? একপাশে উঁচু বালির স্তূপ। অপরপাশে পাইলিংয়ের গভীর গর্ত। পানি জমে ভরে আছে। অন্ধকারের কারণে গর্তের নিচ পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। তাহলে কি নিশি তার সাথে...!

এটা ভাবতেই হঠাৎ মাথার পেছন থেকে তীব্র ব্যথা অনুভব করলো সে। দুই চোখ বন্ধ হয়ে এলো ইফতির। সে সরাসরি বালির স্তূপে পড়েছে। একটা লাল তরল খুব দ্রুত গড়িয়ে পড়ছে মাথার পেছন দিক থেকে। কেউ ঘাড়ে পা দিয়ে তার মুখটা নরম ভিজা বালিতে চেপে ধরলো জোরে। বেশ কিছুক্ষণ পা নাড়িয়ে ছটফট করছিলো সে। তখন কারো কাছে চিৎকার দিয়ে সাহায্য চাওয়া বা কোন কিছুই করার অবস্থা ছিলো না তার। কয়েক সেকেন্ড পর নাড়াচাড়া বন্ধ হয়ে গেল ইফতির। শুধু নিস্তব্ধ দেহটাই পরে আছে তার। পাশে মোবাইল ফোনটাও।

এত সহজে যে কাজটা শেষ হবে তা কখনো ভাবতে পারেনি শুভ। পা দিয়ে ঠেলে ইফতির নিথর দেহটা পাশের পানি ভর্তি গর্তে ফেলে দিলো।

পানিতে লাশ পড়ার দুম করা শব্দটা খুব বেশি দূর যায়নি। আর গেলেও কোন সমস্যা হওয়ার কথা না। ইফতির ফোনটা হাতে তুলে সুইচ্ অফ করে ব্যাগে রাখলো সে। লোহার পাইপটা ঠিক জায়গায় রেখে হাতের গ্লাভ্স খুলে ব্যাগে ভরতে ভরতে ওখান বেরিয়ে আসলো শুভ।

রাস্তায় বেরিয়ে সবার আগে সে নিশিকে ‘mission completed’ লেখা একটা মেসেজ্ সেন্ড করলো।

অপর প্রান্তে শুধু তৃপ্তিময় রহস্যের একটা হাসি হাসলো একজন। যেন এমনটি হওয়ারই কথা। শুধু এই মেসেজটার জন্যই কেউ একজন অপেক্ষা করছিলো।


ঘটনার পর দেখতে দেখতে সাত আট দিন চলে গেছে। বলতে গেলে এ কয়দিন বাইরের জগতের সাথে সম্পূর্ণ যোগাযোগহীন ছিলো শুভ। এমন কি নিশির সাথেও আর কোন কথা হয়নি তার। তেমন কোন সমস্যার মাঝেও পড়তে হয়নি শুভকে। ইফতি অতি বড়লোকের বিগড়ে যাওয়া সন্তান। তার মা-বাবার টাকা পয়সার অভাব নেই। বলতে গেলে টাকা পয়সাকেই তাদের দুনিয়ার সব বানিয়ে নিয়েছে। টাকাই তাদের সব। সন্তানের দিকে নজর দেওয়ার সময়টা পর্যন্ত নেই। আর ইফতিরও মাঝে মাঝে টাকা নিয়ে এর চেয়েও বেশি সময় ধরে মিসিং হওয়ার ইতিহাস একাধিক আছে। সে যে মাঝে মধ্যেই এমনভাবে হারিয়ে গিয়ে আবার কিছুদিন পর ফিরে আসে। এটা সবারই জানা। তাই এটা কারো মাথা ব্যথার বিষয় না। অতএব এ ঘটনার জন্য থানায় সাধারণ ডায়রি করা আর দু’চারজন বন্ধু-বান্ধবের বাসায় খোঁজ নেওয়া ছাড়া তেমন কিছুই করা হয়নি।

দুই সপ্তাহ পর ফোনে শুভর সাথে নিশির প্রথম কথা। হ্যালো... নিশি?

: হুম।

: ভালো আছো?

: ... ... ...। ও প্রান্তে আওয়াজ নেই। 

: কথা বলছো না যে?

: ভালো।

: তাহলে এখন কি আমরা দেখা করতে পারি?

: না।

: না..! কেন?

: আর একবার কাজটা করতে হবে।

: মানে...!

: করবে না তুমি?

: ... আবারও চুপ ও প্রান্ত।

: কি হলো?

: ... ... নিরব।

: তাহলে করছো না?

: হুম। নাম বলো।

: গুড বয়। আই লাইক ইট।

: নাম বলো?

: দাঁড়াও, এত তাড়া কিসের?

: প্লিজ নামটা বলো?

: দীপন।

: দী-প-ন-ন!!

: হুম, দীপন।

: ... ... ...।

: ... ... ...। উভয় প্রান্তে কেবল নিঃশ্বাসের শব্দ।

: ওকে হয়ে যাবে। বাই রাখছি।


মাথাটা ভনভন করে ঘুরছে শুভর। দীপন আর শুভ বেষ্ট ফ্রেন্ড। এর চেয়েও বড় কথা দীপন হিন্দু কিন্তু নিশির সাথে কি এমন হতে পারে যার জন্য...?

একদিকে তার দুনিয়া নিশি আর অন্য দিকে প্রিয় বন্ধু। কাকে বেছে নিবে শুভ?

প্রত্যেক মানুষের জীবনে এমন বিশেষ কেউ থাকে। যার কোন কথায় না করা যায় না। তার হাসির দিকে তাকিয়ে সব কষ্ট হাসি মুখে মেনে নেয়া যায়। তবে নিশি শুভর কাছে শুধু বিশেষ না অতি বিশেষ কেউ।

আজ পর্যন্ত সে নিশির কোন কথায় না বলেনি। তাই এটাও না করবে না। আর কখনো করতে চায়ও না। তবে এবারের কাজটা বেশ জটিল শুভর জন্য। নিশির নিষিদ্ধ নিমন্ত্রণে যে দীপন ইফতির মতো সাড়া দেবে না, সেটা নিশ্চিত। তাই এই কাজটা একটু বুঝে শুনেই করতে হবে শুভকে।


কিছু দিন পর... ...।

আবার সেই আগের মতোই একটা রাত। ব্যতিক্রম শুধু আজ আকাশে চাঁদ নেই। রাস্তায় স্ট্রিট লাইটের আলোও তেমন নেই। রাস্তাঘাটেও মানুষের আনাগোনা। আর পরিবেশ সম্পূর্ণ ওই দিনের বিপরীত। শুভ অনেকটা  আগেই চলে এসেছে আজ।  প্ল্যান অনুযায়ী আটটা ত্রিশ মিনিটে দীপনের আসার কথা। তবে শুভ পাশের বিল্ডিংয়ের ছাদের এক কোণে বসে আছে। কারণ এখান থেকে দীপনের আসা এবং ওই জায়গার উপর নজর খুব ভালো করেই রাখা যাবে। দশতলা ভবনের ছাদটা বিশাল। আর অনেক অন্ধকারের মাঝে এত বড় ছাদে কেউ থাকলে বুঝাও যাবে না। আটটা ত্রিশ মিনিটে দীপনের নিচে এসে শুভকে ফোন দেওয়ার কথা।

দীপন আসবে ঠিক সময়েই। সে কখনো শুভকে অপেক্ষা করায়নি। আজও করাবে না। সেই কলেজ দিনের শুরু থেকে আজ প্রায় দুই বছর তাদের বন্ধুত্ব। দপ্রণ মাঝে মাঝেই তাকে বলতোÑ ‘জানিস শুভ! তোর জন্য আমি জীবন দিতে পারি।’ আর শুভ তা শুনে হাসতো। কিন্তু আজ যেনো সত্যি প্রিয় বন্ধুর জীবনটা নেয়ার সময় চলে এসেছে। ছাদের কোণে বসে অনেক কিছু ভাবছে সে। এরপর কখনো সুযোগ পেলে নিশিকে নিয়ে এখানে আসবে। একসাথে বসে আকাশ দেখবে তার চোখে।

নিশির চোখে দেখবে মানে তার অবাক হওয়া চোখগুলো দেখবে। কারণ এখান থেকে দেখা আকাশটা বিশাল না, অনেক বিশাল।

আটটা পঁচিশ মিনিট। নিশিকে একটা ফোন দেওয়া দরকার। এত দিনের মাঝে আজকের প্ল্যান জানানো ছাড়া তার সাথে নিশির আর কোন কথা অথবা যোগাযোগ হয়নি। কিন্ত এই মুহূর্তে কেন জানি খুব মনে পড়ছে নিশির কথা। ফোন দেওয়ার পর প্রথমবার রিং হলো। কেউ ধরলো না। দ্বিতীয় বারও একই রকম কিন্তু তৃতীয় বার হঠাৎ একটা পরিচিত কণ্ঠে চমকে উঠলো শুভ। তার আগেই কেউ এসে এই ছাদে লুকিয়ে ছিলো যা সে টের পায়নি। পেছনে তাকিয়ে দীপন, হৃদয় আর আবিরের হাতে তিনটি লোহার পাইপ দেখতে পেলো শুভ।

দীপনের হাতের পাইপটা খুব চেনা চেনা লাগছে...! আরে এটাই তো!

যা বুঝার অনেক আগেই বুঝে নিয়ছে শুভ। সে তার নিজের পাতা ফাঁদেই আটকা পড়েছে এখন। শুভরও আজ করার কিছু নেই। সেদিনের নির্মম ঘটনারই পুনরাবৃত্তি ঘটলো আর একবার। তবে আজকের ঘটনাটার মাঝে একটু ব্যতিক্রম কিছু আছে হয়তো।

অনেকদিন পর আবার বন্ধ হয়ে যাওয়া কনস্ট্রাকশন কাজ শুরু হলো পুরোদমে। পাইলিং করা গর্তগুলো বালি দিয়ে পূর্ণ করে দেওয়া হয় তার অনেক আগেই। লাশ তিনটে মনে হয় গলে যাওয়ায় অথবা অন্য কোন কারণে খুঁজে পাওয়া যায়নি।


এই জায়গাটিতে আজ পাশাপাশি দুটো বহুতল ভবন। অবাক দুনিয়া অবাক সব কিছু। মুখে সেই রহস্যময় হাসিটা নিয়ে ছাদের এক কোণে বসে আছে নিশি। আর তার চোখে আকাশ দেখছে আবির... ...!




Comments
* The email will not be published on the website.