গল্প: দুলাহ মিয়া


by  শফীউদ্দীন সরদার



: নাম?

: দুলাহ মিয়া।

: হোয়াট?

: আমার নাম দুলাহ মিয়া।

: দুলা মিয়া মানে?

: মানেটা বোঝানো কঠিন স্যার। আব্বা আম্মা নাম রাখলেন সুজাউদৌলাহ। কিন্তু তা হলে কি হয়? পড়শীরা পাঁচজন কি আস্ত থাকতে দিলে ওটা? তারা ওটাকে ঠেলতে ঠেলতে প্রথমে দৌলাহ আর সব শেষে দুলাহ মিয়াতে এনে তবে ছাড়লে। এখন আমার আব্বা আম্মাও আমাকে দুলাহ বলে ডাকেন। আত্মীয় পরিজন সবাই বলেন দুলাহ মিয়া।

: তা বলুক। ঐসব দুলাহ মিয়া ফুলাহ মিয়া এখানে চলবে না। চাকরি পেতে হলে সেরেফ মিয়া মানে মিয়া সাহেব হতে হবে তোমাকে।

: জি স্যার। যা বলবেন, তাই হবো।

: হতেই হবে। এবার বলো, লেখাপড়া কতখানি করেছো?

: অনেকখানি স্যার। সে দিক দিয়ে কম বলতে পারবে না কেউ?

: কি রকম? অনেকখানি কতখানি।

: অনেকখানি... অনেকখানি। বাল্যশিক্ষা, আমার বই, ছড়াপড়াÑ এগুলো সবই ছরছর করে পড়তে পারি।

হেসে ফেললেন হক সাহেব। হক এ্যান্ড কোম্পানির স্বত্বাধিকারী মো. আজিজুল হক সাহেব। বললেন, ও আচ্ছা। তা বাড়ি কোথায় তোমার?

জবাবে দুলাহ মিয়া বললোÑ গাঁয়ে। বগুড়া জেলার এক দূরবর্তী গাঁয়ে।

: বটে। তা তোমাকে চেনে এমন কেউ এই ঢাকা শহরে আছে?

: আছে স্যার। এখানকার থানার ওসি সাহেব আমাকে চেনেন। আমাদের একই গাঁয়ে বাড়ি।

: বলো কি! ওসি সাহেব চেনেন? তাহলে তো খুব ভাল কথা।

: আপনি ড্রাইভার চান, এই বিজ্ঞাপন কাগজে দেখেই আমি ওসি সাহেবের কাছে এলাম। উনিই আমাকে আপনার বাড়িটা চিনিয়ে দিলেন।

: বহুৎ খুব বহুৎ খুব। তা তোমার ড্রাইভিং লাইসেন্স তো আছে নিশ্চয়ই?

: জি স্যার আছে। এই যে আমার লাইসেন্স। নাম চেহারা মিলিয়ে নিন স্যার। লাইসেন্সটা হাতে নিয়ে হক সাহেব তার দিকে তড়িৎ চোখ বুলালেন। এরপর বললেনÑ হ্যাঁ-হ্যাঁ, ছবিটা তো তোমারই; নামও তো দেখছি সুজাউদৌল্লাহ, ওরফে দুলাহ মিয়া। বেশ বেশ।

লাইসেন্সটা ফেরত নিয়ে দুলাহ মিয়া বললোÑ অনেক শহরে গাড়ী চালিয়েছি স্যার। অনেকদিন থেকে আমি গাড়ী চালাই।

: ঢাকা শহরে চালিয়েছো কখনো?

: জি? তা কথা হলো, অসুবিধে হবে না স্যার।

হক সাহেব নারাজকণ্ঠে বললেনÑ উঁহু, মুখে বললে তো হবে না। মফস্বল শহরে গাড়ী চালানো আর ঢাকা শহরে গাড়ী চালানো এক কথা নয়।

: হবে না স্যার, কোনই অসুবিধে হবে না। দয়া করে আমাকে নিয়োগ করে দেখুন, আমার কাজ দেখে খুশি ছাড়া নাখোশ আপনি হবেন না।

: না-না, তা হয় না। পরীক্ষা করে না দেখে সরাসরি তাহলে নিয়োগ করা যাবে না। ঢাকায় গাড়ী চালানো নিয়ে যেখানে কথা।

: তাহলে তাই-ই করুন স্যার। যেভাবে ইচ্ছে পরীক্ষা করে নিন।

: হ্যাঁ, তাই-ই করবো। আমার বড় ছেলের ড্রাইভার মকবুল হোসেন পাকা ড্রাইবার। তার কাছেই পরীক্ষা দাও। বিজ্ঞাপন দেয়ার তিন চার দিন পার হয়ে গেল। তবু সুবিধে মতো লোক যখন কেউ এলো না তখন তোমাকেই পরীক্ষা করে দেখি।

অতঃপর তিনি মকবুল হোসেনকে ডেকে নিয়ে দুলাহ মিয়াকে তার গাড়ীতে তুলে দিলেন এবং দুলাহ মিয়াকে ভাল করে পরীক্ষা করে দেখতে বললেন। দুলাহ মিয়াকে ড্রাইভিংয়ে বসিয়ে দিয়ে মকবুল হোসেন তার পাশে এসে বসলো এবং গাড়ী ছাড়তে বললো। ছুটতে লাগলো গাড়ী। ঘণ্টা দুয়েক শহরের অলিগলি ও নানা পথে ঘোরার পর মকবুল হোসেন ফিরে এসে হক সাহেবকে বললোÑ কি তাজ্জব ব্যাপার স্যার! কাকে পরীক্ষা করতে বলছেন আমাকে? এ লোক তো আমার ওস্তাদেরও বড়। তার কাছে আমার নিজেরই শেখার আছে অনেক। এতবড় মজবুত ড্রাইভার খুব কমই আমি দেখেছি।

হক সাবে খুশি হয়ে বললেনÑ তাই নাকি? তাহলে সত্যিই ছেলেটা একজন ভাল ড্রাইভার?

মকবুল হোসেন বললোÑ ভাল কি বলছেন স্যার। যথেষ্ট ভাল ড্রাইভার। আপনার কাজ তো খুবই হালকা-পাতলা কাজ। ওর কাছে এ কাজ একেবারেই মামুলি।

: অর্থাৎ?

: আপনার তো ব্যবসার ঝামেলা আর নেই। আপনার ছেলেরাই সব বুঝে নিয়েছেন পুরোপুরি। তাদের গাড়ী ড্রাইভারও আলাদা। ব্যবসার কাজে আপনাকে আর ছুটোছুটি করতে হয় না। আপনার ড্রাইভারের কাজ কেবল আপামণিকে ভার্সিটিতে নিয়ে যাওয়া, নিয়ে আসা আর মাঝে মধ্যে আপনাকে নিয়ে একটু এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ানো।

এ কাজ ঐ দুলাহ মিয়া মানে ঐ মিয়া সাহেব হেসে খেলে করতে পারবে।

: করতে পারবে? ঠিক বলেছো?

: জি স্যার। আপনি নিশ্চিন্তে ওকে নিয়োগ করতে পারেন।

ঐদিনই হক সাহেব দুলাহ মিয়াকে ডেকে বললেনÑ সাব্বাশ নওজোয়ান। পরীক্ষা ভালভাবেই পাশ করেছো তুমি! তোমাকে নিয়োগ করতে এখন আমি প্রস্তুত। কিন্তু কিছু শর্ত আছে এর সাথে। পয়লা শর্ত, তোমার থাকা খাওয়া সব এখানে। অন্য কোথাও গিয়ে থাকা তোমার চলবে না। দ্বিতীয় শর্ত, গাড়ী চালানো কাজ আমার অল্প। গাড়ী চালানোর বাইরেও কিছু ফাই ফরমায়েশ খাটতে হবে আমাদের। এতে তুমি রাজী?

: জি স্যার, জি। আমার কোন আপত্তি নেই।

: আমাদের মানে, সেরেফ আমার আর আমার নাতনীর কিছু ফাই-ফরমায়েশ। বাড়ির আর সকলের অনেক চাকর নফর আর লোকজন আছে। ব্যক্তিগতভাবে কেবল আমাদেরই কেউ নেই। টুকিটাকি কাজগুলো সময় মতো করে দেয়ার কাউকে পাওয়াই যায় না তেমন। এগুলো তোমাকে করতে হবে।

: করবো স্যার, যা করা দরকার সব আমিই করে দেবো। অন্য কারো প্রয়োজনই আর পড়বে না।

: গুড।

হক সাহেব খুশি হয়ে দুলাহ মিয়াকে নিয়োগ দান করলেন।

কিন্তু খুশি হলো না হক সাহেবের নাতনী ফিরোজা বানু বেগম। পরের দিন সকালেই সে তার নানাজানকে আক্রমণ করে বললোÑ এ কি রকম লোক নিয়োগ করলেন নানা? খুঁজে আর লোক পেলেন না?

আজিজুল হক সাহেব জোর দিয়ে বললেনÑ দরেজ লোক, দরেজ লোক। বড়ই এক্সপার্ট ড্রাইভার।

: সেইটেই কি বড় কথা হলো? তার চেহারার দিকে তাকালেন না?

: তাকাই নি মানে? তার চেহারাটাই তো আমাকে আরো কাবু করেছে বেশি। ওহ! কি মনোরম চেহারা! সিনেমার অনেক নায়কই এর চেহারার কাছে ফেল।

: সমস্যাটা তো ওখানেই। লেখা জানে না পড়া জানে না অথচ নায়ক নায়ক চেহারা। এসব লোকের চরিত্র কি ভাল হয় কখনো? কোন বয়সী লোক পেলেন না?

: তা কথা হলো অসুবিধে হবে বলে তো মনে হয় না। কথাবার্তায় ছেলেটা খুবই ভদ্র আর নম্র। এর উপর ফের নামাজী। প্রতি ওয়াক্তেই নামাজ পড়তে দেখলাম। পরহেজগার ছেলেরা তো বেয়াদব হয় না।

: কিন্তু...

: দু’চার দিন কাজে লাগিয়ে দেখো। যদি উল্টাপাল্টা দেখা যায়, বিদেয় করে দেবো।

উল্টাপাল্টা কিছুই দেখা গেল না। যথেষ্ট সদগুণ ছাড়া এই নতুন ড্রাইভারের মধ্যে দোষের কিছুই চোখে পড়লো না। নীরবে গাড়ী চালায়। কথা বললে তার জবাব দেয়, না বললে নিজে সে কোন কথা বলে না। ফিরোজার দিকে সরাসরি চোখ তুলেও তাকায় না। যা হুকুম হয় সঙ্গে সঙ্গে তা পালন করে হৃষ্টচিত্তে।

কয়েকদিন কেটে গেল। একদিন ভার্সিটিতে যেতে যেতে ফিরোজা বানু প্রশ্ন করলোÑ তোমার নামটা এমন বিদঘুটে কেন? ‘মিয়া সাহেব’ কোন একটা নাম নাকি?

: জি না, আমার নাম দুলাহ মিয়া। স্যার বললেন, ও নাম চলবে না। এখন থেকে তুমি মিয়া সাহেব। তাই মিয়া সাহেব হয়ে গেলাম।

ফিরোজা বানু ঈষৎ হেসে বললোÑ অমনি মিয়া সাহেব হয়ে গেলে?

: জি ম্যাডাম।

: এই খবরদার! ও সব ম্যাডাম ফ্যাডাম কখখনো বলবে না। আপা বলবে, আপা।

: জি-জি, আপা।

একটু পরে ফিরোজা ফের প্রশ্ন করলোÑ শুনলাম অনেকদিন থেকেই গাড়ী চালাও। নেশাটেশা কিছু করো না?

: নেশা!

: ড্রাইভারেরা তো অনেকেই নেশাখোর। মদ-গাঁজা খায়। তুমি খাও না?

: তওবা তওবা, মুসলমানের জন্যে ওসব গুনাহ আপা। ওসব খেলে ঈমান থাকে না।

: সিগারেট, বিড়ি?

: ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্যে ক্ষতিকর। না বুঝে আগে দু’চারটে খেতাম। এখন আর খাইনে।

দুলাহ মিয়ার সৎ স্বভাবে আর সৎ আচরণ দেখে ফিরোজা বানুর তামাম দ্বিধা দূর হলো দিনে দিনে এবং কালক্রমে সে তার সাথে এক হয়ে মিশে গেল।

এতে আবার পয়দা হলো আর এক ফ্যাসাদ। দুলাহ মিয়ার আকর্ষণীয় চেহারা দেখে ফিরোজার বান্ধবী, আত্মীয়-স্বজন আর পড়শীরা এক একজন এক একভাবে ভুল করতে লাগলো। দুলাহ মিয়াকে কেউ ভাবলো ফিরোজা বানুর বর, কেউ ভাবলো হবু বর। কেউ ভাবলো ফিঁয়াসে। অর্থাৎ প্রেমিক ধারণা তাদের মিথ্যা হয়ে যাওয়ায় প্রথমে সবাই হোঁচট খেতে লাগলো এবং পরে ফিরোজার চরিত্র এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে পাঁচজনে পাঁচ রকম বলতে শুরু করলো।

ফিরোজা বানুকে নিয়ে যেতে এসে দুলাহ মিয়া সেদিন চুপচাপ বসেছিল ইউনিভার্সিটির লনে। ক্লাশ শেষে কয়েকজন বান্ধবীসহ ফিরোজাবানু তার দিকে এগিয়ে এলো এবং ডাক দিয়ে বললোÑ এসো মিয়া, এবার যাওয়া যাক।

দুলাহ মিয়া এগিয়ে আসতেই তার দিকে ফিরোজার বান্ধবীদের দুই চোখ স্থির হয়ে গেল। তারা থমকে দাঁড়িয়ে গিয়ে বিহŸলকণ্ঠে বললোÑ ও মাই গড! কি হ্যান্ডসাম চেহারা! কে রে ফিরোজা, ইনি তোর কে হন?

ফিরোজা বানু থতমত করে বললোÑ না না, আমার কেউ হয় না।

বান্ধবীরা এবার অনুচ্চকণ্ঠে বললোÑ হয় না? তাহলে হবু কেউ নিশ্চয়ই।

: তার মানে?

: মানে তোর প্রেমিক, তোর হবু বর। আহা, এমন খাশা চেহারা কোথা থেকে যোগাড় করলি ভাই! এমনটি পাওয়ার জন্যে যে কোন মেয়েই দরিয়ায় ঝাঁপ দিতে ইতস্তত করবে না।

ফিরোজাও অনুচ্চকণ্ঠে বললোÑ ছিঃ! এসব কি বলছিস! ও আমার ড্রাইভার।

প্রচণ্ড হোঁচট খেলো বান্ধবীরা। বললোÑ ড্রাইভার?

: হ্যাঁ, আমার ড্রাইভার।

: হাউ ষ্ট্রেঞ্জ। ড্রাইভারের এত সুন্দর চেহারা! এমন সুপুরুষ।

বান্ধবীরা মুখ চাওয়া চাওয়ি করতে লাগলো। একজন ফের সখেদে বললোÑ হা ইশ্বর! হতভাগীকে কি শেষ পর্যন্ত ডোবাতেই ডুবিয়ে মারবে তুমি?

চলতেই লাগলো এই জের। কুৎসা, সন্দেহ আর কানাঘুঁষা। ভার্সিটির নষ্ট ছেলেরা নেচে উঠলো এ খবরে। সুন্দরী ফিরোজা বানু তুচ্ছ একজন ড্রাইভারের ভোগ্যা শুনে তারাও মওকা খুঁজতে লাগলো।

সেদিন ভার্সিটি থেকে বেরিয়ে আসতেই গাড়ীর চাকা গড়বড় করতে লাগলো। এতে করে রাস্তার একপাশে থামিয়ে দুলাহ মিয়া গাড়ী থেকে নামলো এবং লোহার রডের স্ক্রু ড্রাইভার দিয়ে চাকা টাইট দিতে লাগলো। এই সময় তিন চার জন ছাত্র নামের সন্ত্রাসী এসে গাড়ীর দুই পাশে দাঁড়ালো এবং নেতা গোছের একজন ফিরোজা বানুকে উদ্দেশ্য করে বললোÑ আসুন ম্যাডাম, ড্রাইভার গাড়ী ঠিক করছে করুক, এই ফাঁকে পার্কে ঢুকে আমরা একটু মৌজ করি, আসুন।

ফিরোজা বানু গরমকণ্ঠে বললোÑ তার মানে?

: মানে আমাদের একটু প্রেমদান করবেন আসুন। অনেকদিন পরে বাগে পেয়েছি আজ। আজ আর ছেড়ে কথা বলছিনে। নেমে আসুন।

: বটে! সরুন, সরে যান আপনারা এখান থেকে। এই আপনাদের চরিত্র?

: কেন ম্যাডাম? একজন তুচ্ছ ড্রাইভারের সাথে চুটে প্রেম চালাচ্ছেন দিনরাত। আমাদের বেলায় এই সতীপনা কেন?

: অভত্য, ইতর!

দুলাহ মিয়া এবার আওয়াজ দিলোÑ এই, খবরদার!

: আরে থামো মিয়া। আমরা ভদ্র ঘরের উচ্চ শিক্ষিত সন্তান। এঁর সাথে পড়ি। তুমি একজন গণ্ডমূর্খ ড্রাইভার। থার্ড ক্লাশ লোক। আমাদের কথার মধ্যে তুমি কথা বলো কেন?

ফিরোজা বানু বললোÑ আপনারা যাবেন, না চিৎকার দিয়ে লোক জোটাবো। এই! কি ভদ্র ঘরের সন্তান সব!

সন্ত্রাসীদের একজন বললোÑ মুখের কথায় হবে না উস্তাদ। জোর খাটান। টেনে ওকে বের করুন গাড়ী থেকে। শূন্যে শূন্যে নিয়ে চলুন।

‘ঠিক ঠিক’ বলে সবাই গাড়ীর দুয়ারে হাত দিলো। আগুন ধরলো দুলাহ মিয়ার মাথায়। ‘তবে রে’ বলে সে হুংকার দিয়ে উঠলো। লোহার রডটা বাগিয়ে ধরে বাঘের মতো লাফিয়ে পড়লো তাদের সামনে। রডটা এবার ঊর্ধ্বে তুলে সগর্জনে বললোÑ বাঁচতে চাও তো পালাও। নইলে ফাটলো মাথা। ইয়া আলী...!

ড্রাইভারটা যে হঠাৎ এমন ভয়াল মূর্তি ধারণ করবে এতটা ভাবতেই পারেনি সন্ত্রাসীরা। রডটা মাথার উপর পড়ো পড়ো দেখে সবাই চমকে উঠলো। কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় তারা সরে পড়লো সুড় সুড় করে।

চাকা ঠিক করা শেষ হয়ে গিয়েছিল। দুলাহ মিয়া গাড়ীতে উঠে গাড়ী স্টার্ট দিতে গেল। ফিরোজা বানু এতক্ষণ দম বন্ধ করে ছিল। এবার সে কম্পিতকণ্ঠে বললোÑ তুমি ওভাবে ওদের সামনে লাফিয়ে পড়লে কেন? নামেই ওরা ছাত্র। আসলে মার্কামারা সন্ত্রাসী সবাই। সাথে পিস্তল থাকে। তোমাকে গুলি করতো যদি?

জবাবে দুলাহ মিয়া বললোÑ তো কি করবো? আপনাকে ওদের হাতে ফেলে রেখে কি পালিয়ে যাবো আমি?

ফিরোজা বানুর তৎপরতায় মিয়া সাহেব থেকে দুলাহ মিয়ার নাম আবার দুলাহ মিয়াতেই ফিরে এলো। হক সাহেবও এখন তাকে দুলাহ মিয়া বলেই ডাকেন। সেদিন বিকেলে সমবয়সী এক ব্যবসায়ীর সাথে ড্রয়িংরুমে বসে গল্প করছিলেন হক সাহেব। গল্পের মাঝেই তিনি হাঁক দিলেনÑ দুলাহ মিয়া, দুলাহ মিয়া...!

দুলাহ মিয়া এলে তিনি বললেনÑ আমার বড় ছেলে এসে থাকলে তাকে ঘরে থাকতে বলো। তার সাথে কিছু জরুরী কথা আছে আমার। হুট করে আবার যেন বাইরে বেরিয়ে না যায়।

: ‘জি আচ্ছা!’ বলে চলে গেলো দুলাহ মিয়া। তাকে দেখে আগন্তুক ভদ্র লোকটি মোহিত কণ্ঠে বললেনÑ নাত জামাই বুঝি! বড় দর্শনধারী নাত জামাই যোগাড় করেছেন তো! নাতনীর শাদি দিলেন অথচ দাওয়াতটাও পেলাম না?

হক সাহেব সবিস্ময়ে বললেনÑ নাত জামাই! নাত জামাই কোথায় দেখলেন?

: কেন, এই যে দুলাহ মিয়া বলে ডাক দিলেন যাকে?

হক সাহেব হেসে বললেনÑ কি যে বলেন! ও আমার নাত জামাই হবে কেন? ওতো আমার ড্রাইভার।

: ড্রাইভার! সে কি! তাহলে দুলাহ মিয়া বললেন কেন?

: ওর নামটাই যে দুলাহ মিয়া। বিদঘুটে এক নাম।

: তাজ্জব!

কিছুক্ষণ হতবাক হয়ে রইলেন ভদ্রলোক। এরপরে ফের বললেনÑ তা নাতনীটার শাদির কথা কিছু চিন্তা ভাবনা করছেন কি? কোন সম্বন্ধ কোথাও থেকে এলো? মানে, কোথাও কোন সম্বন্ধ দেখছেন কি?

হক সাহেব গম্ভীরকণ্ঠে বললেনÑ তা আমি সম্বন্ধ দেখে কি করবো বলুন? নাতনীর যে আমার কিছুই পছন্দ হয় না।

: পছন্দ হয় না?

: হয় কৈ? আমার বাল্যবন্ধু রকিব সাহেবের নাম তো শুনেছেন। মস্ত বড় সম্পদশালী লোক। খুবই উঁচু ঘর। তার এক নাতী সাত আট বছর বিলেত থেকে লেখাপড়া করেছে। এক্ষণে ব্যারিস্টার হয়ে দেশে ফিরে এসেছে। আমার নাতনী ফিরোজাকে রকিব সাহেবের খুব পছন্দ। ফিরোজার সাথে তার সেই নাতিকে শাদী দেয়ার জন্যে কত ঝুলাঝুলি করলেন তিনি। কিন্তু ফিরোজা কিছুতেই রাজী হলো না এ শাদীতে।

: সেকি! রাজী হলো না কেন?

: আমার নাতনীকে তো জানেন। বড়ই পরহেজগার মেয়ে। নামাজ রোজায় পারদর্শী। দীর্ঘদিন বিলেতে থাকা ঐ ছেলেকে কিছুতেই সে খসম বলে মেনে নিতে রাজী নয়।

: কারণ?

: কারণ ছেলেটার চরিত্র ও চালচলন। যে পরিবেশ থেকে এসেছে সেই পরিবেশ। ওদেশে তো নারী-পুরুষর অবৈধ সম্পর্ক ভাত-মাছের মতোই মামুলি ব্যাপার। মদ খাওয়া নেশা করা নিত্য-নৈমিত্তিক ঘটনা। ওদেশে যারা দীর্ঘদিন থাকে তাদের মধ্যে ঐসব বদগুণ আপছে আপ চলে আসে। নামাজ রোজার ধার ধারে না তারা। আল্লাহ রাসূল মানে না। আমার নাতনীটি জেনেছে, ঐ বদগুণগুলো তামামই সাথে নিয়ে দেশে ফিরেছে ছেলেটা। চালচলনও ¤েøচ্ছের চালচলন। এরপর আর তাকে শাদী করতে রাজী হয় কি করে বলুন?

: তা বটে, তা বটে। নাতনী আপনার ঠিকই করেছে। আমার জানামতে যারাই ওদেশে দীর্ঘদিন থেকেছে, তারা প্রায় সবাই সাহেব হয়ে দেশে ফিরে এসেছে। ইসলামী আদম আখলাক কিছুই তাদের মধ্যে দেখতে পাওয়া যায় না। এ রকম ছেলে নেবেন কেন?

অঢেল সম্পদ আছে আপনার। আপনার বাপ-মা মরা ঐ নাতনীরও শুনি অনেক বিষয় সম্পদ আছে। দেখে শুনে একটা পরহেজগার ছেলে যোগাড় করে নিন।

: হ্যাঁ, তাই করবো ভাবছি। একটা বছর পরেই এমএ দেবে ফিরোজা। পরীক্ষাটা হয়ে গেলেই সে চেষ্টা জোরদারভাবে নেবো।

দিন যতই যেতে লাগলো দুলাহ মিয়ার আচরণে তাার পতি ফিরোজা বানু ততই বেশি আকৃষ্ট হতে লাগলো। নামাজ কালাম ইবাদত-বন্দেগী তো আছেই, সেই সাথে কাজকামের প্রতি তার নিষ্ঠা আর ফাই ফরমায়েশ খাটাতে তার নিরহংকার মনোভাব ফিরোজাকে ক্রমেই মুগ্ধ করতে লাগলো।

একদিন একটা ছেঁড়া স্যান্ডেল হাতে নিয়ে ফিরোজা বানু ব্যস্তভাবে চাকর বাকরদের খোঁজ করতেই দুলাহ মিয়া এসে বললেনÑ কি হয়েছে আপা, চাকর বাকর ডাকছেন কেন?

স্যান্ডেলটা তুলে ধরে ফিরোজা বানু বললোÑ এই যে স্যান্ডেলের এই ফিতেটা ছিঁড়ে গেল হঠাৎ, নতুন স্যান্ডেল। মুচির কাছে দিলেই আবার পায়ে দিতে পারি। কিন্তু ডাকহাঁক করে চাকর বাকর কাউকেই পাচ্ছিনে।

: আরে তাতে কি হয়েছে? আমাকে দিন, আমি এক্ষুণি ঠিক করে এনে দিচ্ছি।

: সে কি, তোমাকে? আমার জুতা নিয়ে তুমি যাবে মুচির কাছে। না না, তা হয় না।

: হয় না কেন আপা! এতো একদম মামুলি কাজ। আপনার কাপড় জামা ধোয়ারও জরুরী প্রয়োজন পড়লে আমাকে বলবেন, আমিই ধুয়ে দেবো। সব সময় চাকর নফরের আশায় থাকবেন কেন?

ফিরোজা বানু বিপুল বিস্ময়ে বললোÑ তুমি! তুমি ধুয়ে দেবে? সম্মানে বাধবে না তোমার?

: ছিঃ ছিঃ। তা বাধবে কেন? ঠেকা কাম চালাতে সম্মানে বাধবে কেন? এসব তো আমার চাকরির শর্ত। সব কিছু করে দেয়ার ওয়াদা করেই তো চাকরিতে আমি ঢুকেছি। ওয়াদার বরখেলাপ কখ্খনো করতে পারিনে আমি।

: দুলাহ মিয়া!

: দিন দিন, স্যান্ডেলটা আমাকে দিন...

স্যান্ডেলটা এক রকম জোর করে নিয়েই দুলাহ মিয়া বাজারের দিকে ছুটলো। অবাক বিস্ময়ে চেয়ে রইলো ফিরোজা বানু বেগম।

দশ বারোদিন পরে কিছু উপহার সামগ্রী কিনে এনে হক সাহেব ফিরোজা বানুকে বললেনÑ তোর খালার ভাসুর পুতের আগামীকাল খাৎনা। তারা এসে বিশেষভাবে দাওয়াত দিয়ে গেছেন। না গেলে বলবে, দেয়ার ভয়ে এলো না। তুই রেডি থাকিস।

: কখন যাবেন নানা?

: আগামীকাল সকালে। দুপুরে অনুষ্ঠান। ঘণ্টা তিনেক সময় লাগবে যেতে। সকাল সকাল গিয়ে সকাল সকাল ফিরে আসবো। কিন্তু হক সাহেব নিজে যেতে পারলেন না। রাতে ভীষণ জ্বর এলো গায়ে। সকালেও পুরোদস্তুর লেগেই রইলো জ্বর। বাধ্য হয়ে ফিরোজা বানুকেই যেতে হলো উপহার নিয়ে। সঙ্গে কাউকে নেয়ার চিন্তা করেছিল। কিন্তু সময়মতো কাউকেই হাতের কাছে না পেয়ে একাই সে উঠে বসলো গাড়ীতে এবং দুলাহ মিয়াকে গাড়ী ছাড়তে বললো। যাতায়াত ছয় ঘণ্টা সময়, দিনের পথ, ভয় কি?

যথাসময়েই পৌঁছলো তারা। খাৎনা অনুষ্ঠানও যথা সময়েই শেষ হলো। কিন্তু খাওয়া দাওয়া শেষ হতে বেলা গড়িয়ে গেল অনেকখানি। বিদায় আদায় নিয়ে বেরুতে বেরুতেই বেলা পাঁচটা সাড়ে পাঁচটা বেজে গেল। পথে নেমে তারা হিসাব করে দেখলো, বাসায় পৌঁছতে রাত প্রায় আটটা সাড়ে আটটা বেজে যাবে।

নসীবের লিখন। ভীষণ গরম পড়েছিল দিনের বেলা। সাঁঝ ঘনিয়ে আসতেই গুড় গুড় করে ডেকে উঠলো আসমানের উত্তর-পশ্চিম কোণ। ছোট্ট একখণ্ড মেঘ দেখতে দেখতে ছেয়ে ফেললো গোটা আকাশ। শুরু হলো ঝড়বৃষ্টি। ঝড়বৃষ্টি ঠেলে ঠেলে কিছুপথ এগুনোর পর দুলাহ মিয়া বললোÑ ঝড়বৃষ্টির বেগ ক্রমেই বেড়ে চলেছে আপা। পথে আর লোক চলাচল নেই। কি যে হয়?

ফিরোজা বানু তখন দোয়া দরূদ পড়ছিল। বললোÑ আর ফিরে যাওয়ার উপায় নেই। চালিয়ে যাও, আল্লাহ ভরসা।

কিন্তু মাঝামাঝি পথ পেরুতেই ঝড়ের বেগ বাড়তে বাড়তে সাইক্লোনে রূপান্তরিত হলো এবং রাস্তার উপর গাছপালা ভেঙ্গে পড়ে বন্ধ করলো গাড়ীর গতি। সেই সাথে মুষল ধারে বর্ষণ। দুলাহ মিয়া বললোÑ আগে পিছে আর কোনদিকেই এগুনোর পথ নেই আপা। গোটা গোটা গাছ উপড়ে পড়েছে পথের উপর। রোডস অ্যান্ড হাইওয়েজের লোকেরা লেবার লাগিয়ে এগুলো সাফ করার আগে এ পথে আর কোন গাড়ী ঘোড়া চলবে না। তার চেয়েও বড় কথা, কোন গাছ যে কোন সময় আমাদের গাড়ীর উপর পড়বে তার ঠিক নেই।

ফিরোজা বানু ভীতকণ্ঠে বললোÑ তাহলে এখন উপায়!

: এখানেই যে কোন বাড়িতে আশ্রয় নিতে হবে।

: তাহলে শিগগির তাই করো। অপঘাতে মরতে পারিনে আমরা।

নসীবগুণে নিকটেই একটা পাকাবাড়ি পাওয়া গেল। বেশ বড় লোকের বাড়ি। চারদিকে প্রাচীর। ফটকটা খোলাই ছিল কিন্তু ঘরের দরজা জানালা সব ভেতর থেকে বন্ধ করা। দরজায় এসে কড়া নাড়তেই দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন এক সৌম্যদর্শন মুরুব্বী। প্রশ্ন করলেন কে?

অনুনয়ের সুরে ফিরোজা বানু বললোÑ এই ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে আমরা বড় মুসিবতে পড়ে গেছি জনাব। দয়া করে আমাদের একটু আশ্রয় দিন।

মুরুব্বী ফের প্রশ্ন করলেনÑ কোথা থেকে আসছো তোমরা? মানে বাড়ি কোথায় তোমাদের?

: বাড়ি ঢাকায়।

: ঢাকায় কোথায়?

: মেসার্স হক অ্যান্ড কোম্পানীর নাম শুনেছেন কিনা জানিনে। আমি সেই হক সাহেবের নাতনী।

শুনামাত্রই লাফিয়ে উঠলেন ভদ্রলোক। সোল্লাসে বললেনÑ এ্যাঁ সেকি। হক সাহেবের নাতনী? সোবহান আল্লাহ, সোবহান আল্লাহ! এসো এসো, ভেতরে এসো। কি কাণ্ড, কি কাণ্ড!

ফিরোজা বানু প্রশ্ন করলোÑ তাঁকে আপনি চেনেন?

: চিনবো না মানে? আমরাও ব্যবসায়ী লোক। আমার বড় ব্যবসা তো ঐ হক অ্যান্ড কোম্পানীর সাথে। আমরাই তার মেন ক্লায়েন্ট।

অতঃপর দুলাহ মিয়ার দিকে চেয়ে বললেনÑ তা ইনাকে তো চিনলাম না? তোমার কোন নিকট আত্মীয় বুঝি।

জবাব খুঁজে না পেয়ে ফিরোজা বানু মাথা নীচু করলো। তা দেখে ভদ্রলোক ফের উচ্ছ¡সিত হয়ে উঠলেন। বললেনÑ ও বুঝেছি বুঝেছি। নাতজামাই। হক সাহেবের নাতজামাই। তা এতে শরম পাওয়ার কি আছে।

: জি?

: নাতজামাই ছাড়া যে নাতনীকে অপর পুরুষের সাথে হক সাহেব কখনো ছেড়ে দিতে পারেন না, তা ঠিকই আমরা জানি। যে কট্টরপন্থী লোক তিনি। ভাল ভাল, খুব ভাল। বড় খাশা নাতজামাই যোগাড় করেছেন হক সাহেব। তাঁর নাতনীটির মন ভরেছো তো?

ফিরোজার দিকে চেয়ে হাসতে লাগলেন ভদ্রলোক। দুলাহ মিয়ার সাথে চকিতে দৃষ্টি বিনিময় করে ফিরোজা বানু নতমস্তকে বললোÑ জি জি।

ভদ্রলোক এবার দুলাহ মিয়াকে বললেনÑ সেরেফ হক সাহেবেরই নয়, তুমি আমাদেরও নাতজামাই। এসো এসো, ভেতরে এসো। তোমাদের গাড়ীর ব্যবস্থা পড়ে করছি।

দু’জনকে ভেতরে নিতে নিতে ভদ্রলোক ফের বললেনÑ সেবার এক মজার কাণ্ড ঘটেছিল। দু’জন তরুণ তরুণী এসে রাত্রিকালে আশ্রয় চাইলো। হায় আল্লাহ! খোঁজ নিয়ে দেখি, ওরা স্বামী স্ত্রী নয়, কেউ কারো নিকট আত্মীয়ও নয়। লাইফ এনজয় করে বেড়াচ্ছে। আর যায় কোথায়? অমনি দূর দূর করে কুকুরের মতো দিলাম তাদের তাড়িয়ে।

সঙ্গে সঙ্গে ফিরোজা ও দুলাহ মিয়ার মধ্যে দৃষ্টি বিনিময় হলো এবং স্বামী-স্ত্রীর অভিনয় যাতে করে নিখুঁতভাবে হয়, সেই ইঙ্গিত বিনিময়।

হক সাহেবের নাতনী নাতজামাই হিসাবে আদর আপ্যায়ন খুব ভালভাবেই সম্পন্ন হলো। কিন্তু মুসিবত দেখা দিল শোয়ার বেলায়। দু’জনের এক ঘরে শোয়ার ব্যবস্থা করা হলো। ঘেমে উঠলো উভয়েই। না করার আর উপায় নেই। ঘরে ঢুকে দুয়ার বন্ধ করে ফিরোজা এসে থপ করে বিছানার উপর বসলো এবং পাশেই এক হেলনা চেয়ারের উপর বসে পড়লো দুলাহ মিয়া। অনেকক্ষণ কারো মুখে কথা নেই। পরে ফিরোজা বানু আফসোস করে বললোÑ এতটাই লেখা ছিল কপালে!

দুলাহ মিয়া সান্ত্বনা দিয়ে বললোÑ আফসোস করবেন না আপা। আপনি নিশ্চিন্তে ঘুমান। আমি এই চেয়ারে বসেই কাটিয়ে দেবো রাতটা।

: ঘুমুতে বললেই কি নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারি আমি? যতটা বিশ্বস্তই হও না কেন, তুমি পর পুরুষ। পরপুরুষ ঘর রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমানো কি সম্ভব?

: আরে কয় কি! যাকে বিপদ থেকে বাঁচানো আমার নৈতিক দায়িত্ব, সেই আমি তার বিপদের কারণ হবোÑ এসব ভাবে কি!

: কি বললে?

: আমি বলছি, আপনি ঘুমান। আপনার কোন বিপদ আমার দ্বারা হবে না, অন্তত এটুকু আস্থা আমার উপর রাখুন।

আস্থাটা রাখতেই হলো। মন সাহস না পেলেও চোখ ভয় করলো না। অনেক ধকলের পর রাত একটু গভীর হতেই চোখ দুটো মুজে এলো নির্ভয়ে।

কেটে গেল রাত। সকাল বেলা ধড়মড় করে উঠে ফিরোজা বানু দেখলো, ঐ হেলনা চেয়ারের উপরই গুটিশুঁটি মেরে পড়ে আছে দুলাহ মিয়া। তার কথা আর আচরণের মধ্যে একবিন্দুও ব্যতিক্রম ঘটেনি। এতে করে মনটা তার ভরে উঠলো যেমন, হেলনা চেয়ারের উপর লোকটাকে ঐ অবস্থায় দেখে দুঃখও হলো তেমনি। মনে মনে বললোÑ আহা বেচারা!

যে চিন্তা ফিরোজা বানু অনেকদিন থেকেই করে আসছে, এই একটা রাতের পর ঐ চিন্তাই সে চ‚ড়ান্ত করে ফেললো। বাড়িতে ফিরে আসার পথে সে দুলাহ মিয়াকে বললোÑ এভাবে আর চলে না মিয়া সাহেব। এর একটা ফয়সালা হওয়া চাই।

গাড়ীর গতি শ্লথ করে দুলাহ মিয়া বললোÑ কি চলে না আপা?

: আমাদের এই অভিনয়। অনেকেই জেনে গেছেন আমরা স্বামী-স্ত্রী। এই জের আরো বেশী টানতে গেলে সব ফাঁশ হয়ে যাবেই আর তাতে করে কেলেংকারীর অবধি থাকবে না।

গাড়ীটা থামিয়ে দিয়ে দুলাহ মিয়া বললোÑ তাহলে কি করতে চান আপা?

: আমি তোমাকেই বিয়ে করতে চাই।

: কি যে বলেন আপা! মস্করা করেন কেন? আমি কি আপনার স্বামী হওয়ার যোগ্য?

: যোগ্য নও মানে? সর্বোতভাবে যোগ্য। এত বেশি যোগ্য যে তোমাকে ছেড়ে দিলে, তোমার অর্ধেক যোগ্যতা সম্পন্ন লোকও আমি আর পাবো না।

: তা হবে কেন আপা? আমি লেখাপড়া জানিনে, কোন পদস্থ লোকও নই...!

: আমার পদ আর লেখাপড়ার দরকার নেই। আমি চাই মানুষ। তোমার মতো। নির্মল চরিত্রের বিশ্বস্ত। নিরহংকার, ঈমানদার মানুষ। আমি আজীবন মনে মনে যা চেয়েছি, তোমার মধ্যে তার চেয়ে অনেক বেশি পেয়েছি। আজই কেবল নয়। অনেকদিন থেকেই তোমাকে আমি মনে মনে ভালবেসে ফেলেছি। এখন অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে, শাদীতে আর দেরী করা চলবে না। সত্বর তোমাকে আমি শাদী করতে চাই। তুমি রাজি আছো তো?

: তা আমি রাজী থাকবো না কেন আপা? এ যে আমার আসমানের চাঁদ হাতে পাওয়া। কিন্তু আপনার আত্মীয়-স্বজন, বিশেষ করে আপনার নানাজান এ শাদী মেনে নেবেন কেন?

: মেনে নিলে ভাল, না নিলে বয়েই গেল। নানার কাছে আছি, তাই। আমি কি কারো মুখাপেক্ষী নাকি? মারা যাবার সময় আমার আব্বা আম্মা আমার জন্যে যা রেখে গেছেন, বসে থেকে খেলেও জীবন আমাদের কেটে যাবে। এছাড়া আমি এমএ পাশ করে বেরুলেই তো চাকরি একটা পেয়ে যাবো ইনশাআল্লাহ। বরাবর রেজাল্ট আমার খুব ভাল।

: আপা!

: আর আপা আপা নয়। যা বলছি তার উত্তর দাও। দু’চারদিনের মধ্যেই কথাটা আমি নানাজানের কাছে তুলবো। তিনি না করলে, কাজীর অফিসে গিয়ে শাদী করবো তোমাকে। এরপর আমরা দু’জন আমার আব্বার বাড়িতে চলে যাবো। বাড়িঘর সব ভাড়া দেয়া আছে। একটা অংশের ভাড়া ছাড়িয়ে নিয়ে আমরা বসবাস করবো সেখানে। এসবে তুমি রাজী আছো তো?

: জি জি, আমি রাজী আছি।

: গাছে তুলে দিয়ে মই টান দেবে নাতো?

: মই টান দেয়া মানুষ আমি কোনদিনই নই আপা।


বলি বলি করতে করতে রোজা চলে এলো। রোজার মধ্যে কথাটা নানাজানের কাছে তুলবে কিনা ভাবতেই নানাজানের সেই বাল্যবন্ধু রকিব সাহেব আবার সবান্ধবে এসে হাজির হলেন। রকিব মিয়াকে দেখে হক সাহেব খোশকণ্ঠে বললেনÑ আরে দোস্ত যে! আসুন আসুন। তা হঠাৎ আবার কি মনে করে?

রকিব ওরফে রকিব উদ্দৌলাহ সাহেব হেসে বললেনÑ আমার উদ্দেশ্যে ঐ একটাই। আপনার নাতনীর সাথে আমার নাতীর শাদি দেয়া। আমি যে হাল ছাড়ার লোক নই।

হক সাহেব ¤øানকণ্ঠে বললেনÑ তবুও উপায় নেই দোস্ত। আপনার ঐ বিলেত ফেরত ব্যারিষ্টার নাতীকে যে আমার নাতনী কিছুতেই শাদি করতে রাজী নয়।

রকিব সাহেব হেসে বললেনÑ জামানা বদল গিয়া দোস্ত। এখন নাতনী আপনার এক পায়ে খাড়া।

: কেমন?

: আর কেমন! উভয়ের তাড়াতাড়ি শাদী দিয়ে নাতনী নাতজামাই নিয়ে খোশ হালে ঈদ করুন। ওরা নিজেরা নিজেরাই শাদী করে ফেললে ঈদটা আপনার বিষাক্ত হয়েও উঠতে পারে।

: ওরা! ওরা কারা।

: আমার নাতী আর আপনার নাতনী। ওদের যে আর তর সইছে না...!

: কি আবোল তাবোল বকছেন দোস্ত! আপনার নাতীর সাথে আমার নাতনীর সাক্ষাৎ হলো কোথায়?

: আপনার এই বাড়িতে। অনেকদিন থেকেই তো ওরা দু’জন একসাথেই আছে।

: তার অর্থ? কে আপনার নাতী?

: আপনার ড্রাইভার দুলাহ মিয়া। আপনার নাতনীর মিথ্যা সন্দেহ দূর করার জন্যে, সে ড্রাইভার সেজে আপনার বাড়িতে ঢুকেছে। আসলে সে ¤েøচ্ছও নয়। বেশরাও নয়। নাতী আমার আসলেই একজন ঈমানদার মুসলমান।

: সে কি! দুলাহ মিয়া আপনার নাতী?

: জি, নামও দুলাহ মিয়া, কামেও সে এখন দুলাহ মিয়া।

০০০


Comments
* The email will not be published on the website.